1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

ক্ষমতা যার হাতে, সংগঠনও তার হাতে

গৌতম হোড়
গৌতম হোড়
২৪ মার্চ ২০২৩

নির্বাচন হলে তো লড়াই হবে, হারজিৎ থাকবে৷ তার থেকে এটাই ভালো, ক্ষমতাসীন দলের সংগঠনই শাসন করবে৷ পশ্চিমবঙ্গে সেটাই হয়৷

https://p.dw.com/p/4PAxE
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷
পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা বদল হলেই পেশাজীবী সংগঠনগুলোতেও রাতারাতি ক্ষমতা বদল হয়৷ছবি: picture-alliance/dpa/P. Adhikary

অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ বলে, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা বদল হলেই সংগঠনগুলোও রাতারাতি ক্ষমতা বদল হয়৷ বাম আমলে সরকারি কর্মীদের সংগঠন কো-অর্ডিনেশন কমিটি ছিল চরম শক্তিশালী৷ সরকারি কর্মীদের বিষয়ে তারাই ছিল শেষকথা৷

২০১১ সালে ক্ষমতাবদল হলো৷ কো-অর্ডিনেশন কমিটির প্রতাপও গেল৷ রাতারাতি ক্ষমতাবান হয়ে গেল তৃণমূলের রাজ্য সরকারি কর্মচারী ফেডারেশন৷ তাদের মধ্যে ভয়ংকর কোন্দল আছে৷ মারামারি আছে৷ আলাদা মঞ্চ আছে৷ তা সত্ত্বেও তারাই প্রধান রাজ্য সরকারি কর্মচারী সংগঠন৷

একই ঘটনা ঘটেছে অধ্যাপক ও শিক্ষকদের সংগঠনের ক্ষেত্রে৷ বাম আমলে সিপিএমের শিক্ষক সংগঠন ছিল এবিটিএ৷ তারাই ছিল দোর্দন্ডপ্রতাপ৷ ক্ষমতার বদল হলো৷ এবার তৃণমূলের শিক্ষক সমিতি পশ্চিমবঙ্গ শিক্ষক ও শিক্ষা বিষয়ক কর্মচারী সমিতি সেই জায়গায় চলে গেল৷ বাম আমলে সিপিএম প্রভাবিত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সংগঠন ছিল ওয়েবকুটা৷ তারাই ছড়ি ঘোরাত৷ তৃণমূল আমলে সেই কাজটা করে ওয়েবকুপা৷ সম্প্রতি এই ওয়েবকুপার রাজ্য সভাপতি দাবি করেছেন, বিজেপি-র বর্তমান সভাপতি ও অধ্যাপক সুকান্ত মজুমদার সাত বছর ধরে তাদের সংগঠনের সদস্য৷ বিজেপি-র রাজ্য সভাপতি হওয়ার পরেও তিনি ইস্তফা দেননি৷ আসলে ক্ষমতা যেখানে, কর্মীরাও সেখানে৷

শুধু শিক্ষক, অধ্যাপকদের সংগঠনই, বাম আমলে অধিকাংশ অভিনেতা-অভিনেত্রী ছিলেন বামপন্থি৷ ২০০৬ সালে বিধানসভা ভোটের আগের কথা৷ তখন আমি টিভিতে ছিলাম৷ ভোটের জন্য কলকাতা গিয়ে অ্যাঙ্কারিং করতে হয়েছিল৷ যতজন অভিনেতা ও অভিনেত্রী সেসময় বিভিন্ন আলোচনায় গেস্ট হিসাবে এসেছিলেন, একজনকে বাদ দিয়ে তারা সকলেই দাবি করেছিলেন, তারা বামপন্থি এবং পারিবারিকভাবে বামপন্থায় বিশ্বাসী৷ পাঁচ বছর পরে রাজ্যপাট বদলের সম্ভাবনা যথন প্রব, তখন সবাইকে বলতে শুনেছি, তারা তো তৃণমূলকেই বরাবর সমর্থন করেন৷ ক্ষমতা বদলের সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল, তৃণমূলের ফেডারেশন টলিউড শাসন করছে৷ মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ও তাঁর ভাই স্বরূপ বিশ্বাসের কথাই সেখানে শেষ কথা, এমন অভিযোগ অনেকবার উঠেছে৷ বিধানসভা নির্বাচনের আগে টলিউডে বিজেপি পাল্টা একটা সংগঠন করে প্রাধান্য পাওয়ার চেষ্টা করেছিল৷ কিন্তু সফল হয়নি৷ অল্প কিছু অভিনেতা-অভিনেত্রীই সেখানে গেছেন৷

ভারতে প্রতিটি প্রভাবশালী দলে যে কত শাখা সংগঠন আছে ভাবতে পারবেন না৷ এর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে বিজেপি৷ তাদের তো সিএ, সাবেক সেনা কর্মী, ব্যবসায়ী, তথ্যপ্রযুক্তি, গরু ও উন্নয়ন, সংস্কৃতি, প্রতিরক্ষা, চিকিৎসক, আর্থিক, নির্বাচনী, মৎসজীবী, বিনিয়োগকারীপঞ্চায়েত, খেলাধুলা, শিল্প-বাণিজ্য, ব্যবসায়ী, পুরসভা, প্রবীণ নাগরিক, ম্যানেজমেন্ট, মানবাধিকার-সহ অসংখ্য সেল আছে বিজেপি-র৷

তৃণমূলেরও প্রচুর সেল বা সংগঠন আছে৷ তারাই এখন নিজের নিজের ক্ষেত্রে ছড়ি ঘোরাচ্ছে৷ তার জন্য কোনো সংগঠনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার দরকার হয় নমা৷ বিরোধীদের সঙ্গে শক্তির মহড়া নিতে হয় না৷ তাদের নেতাদের হাতে বিপুল ক্ষমতা থাকে৷ আইনজীবীদের সংগঠন, প্রেস ক্লাবের মতো কয়েকটি সংগঠন ব্যতিক্রম৷ সেখানেও দলবদল আছে৷ মাঝেমধ্যেই শোনা যায়, কোনো জেলায় প্রচুর আইনজীবী বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলের সংগঠনে যোগ দিয়েছেন৷

গৌতম হোড়, ডয়চে ভেলে, নতুন দিল্লি
গৌতম হোড়, ডয়চে ভেলে, নতুন দিল্লিছবি: privat

কিছুদিন আগে মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘিতে বিধানসভা উপনির্বাচনে বাম সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থী বায়রন বিশ্বাস জিতেছেন৷ তারপর মুর্শিদাবাদ বার কাউন্সিলের নির্বাচন হয়েছে৷ সেখানে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থীদের হারিয়ে দিয়েছেন কংগ্রেস-বাম প্রার্থীরা৷ পশ্চিমবঙ্গে, বিশেষ করে মুর্শিদাবাদে এটা সম্ভব হয়েছে, কারণ, এই জেলা হলো কংগ্রেসের লোকসভার নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরীর খাসতালুক৷ মুসলিমপ্রধান এই জেলায় গত বিধানসভায় একটা আসনও পায়নি কংগ্রেস বা বামেরা৷ সব আসনে জিতেছিল তৃণমূল৷ এমন ক্ষেত্রে অবধারিতভাবে সব সংগঠনে তৃণমূল প্রার্থীরা হইহই করে জেতে৷ কারণ এটাই দস্তুর৷

কিন্তু মুর্শিদাবাদ যে এক্ষেত্রে উল্টো রাস্তায় চলেছে তার কারণ, অধীর চৌধুরীর জনপ্রিয়তা এবং দ্বিতীয় কারণ হলো, তৃণমূলের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক ওঠা একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগের প্রতিফলন৷ তাছাড়া গতবার সিংহভাগ মুসলিম ভোটার বিজেপি-কে ঠেকানোর জন্য তৃণমূলকে ভোট দিয়েছিলেন৷ এবার তারা কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছেন৷

কারণ, যাই হোক না কেন, মুর্শিদাবাদ বার অ্যাসোসিয়েশন উল্টো রাস্তায় হেঁটেছে৷ তবে আইনজীবীদের অ্যাসোসিয়েশন অনেক সময় আলাদা রাস্তায় হাঁটে৷ কিন্তু অন্য সংগঠনগুলির ক্ষেত্রে এই কথা খাটে না৷ কারণ, সেখানে ক্ষমতাসীন দলের সংগঠনই ছড়ি ঘোরায়৷

যেহেতু পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা যার হাতে সেই শেষ কথা বলবে, তাই কোনো সংগঠনে কষ্ট করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার দরকার কী, পুরো সংগঠনটা দলের হয়ে গেলে তো লাভ বেশি৷ সেখানে নিজেদের নেতা-নেত্রীরা লড়বেন৷ সবকিছুই দলের হাতে থাকবে৷ নীতি তো একটাই, কোনো ক্ষমতা যেন বিরোধীদের কাছে না থাকে৷ তাই এই বিষয়ে অন্তত ভারতকে পথ দেখাতে পারে পশ্চিমবঙ্গ৷